কাঁঠালিয়া, নারায়ণ বৈদ্য : মা গৃহ পরিচারিকা, বাবা প্যারালাইজড, মেয়ে সোয়েতা সরকার উচ্চ মাধ্যমিকে ৯১.২ শতাংশ নম্বর নিয়ে উত্তির্ন। কাঁঠালিয়ার ছোট্ট এক ঘরে আজও লড়াইয়ের আলো জ্বলে। অভাব, অসুস্থতা আর অনিশ্চয়তার মাঝেও সেই আলো নিভতে দেননি সোয়েতা সরকার। চোখে ছিল স্বপ্ন, বুকভরা সাহস, আর ছিল পরিবারের অসীম ত্যাগ। সেই সংগ্রামের ফলস্বরূপ এবারের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ৯১.২ শতাংশ নম্বর পেয়ে কাঁঠালিয়ার মুখ উজ্জ্বল করলেন এই মেধাবী ছাত্রী।কিন্তু এই সাফল্যের পিছনের গল্পটা শুধুই নম্বরের নয়, এটি এক অসহায় পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের গল্প।পরীক্ষার মাত্র দু’দিন আগে আচমকাই স্ট্রোকে আক্রান্ত হন সোয়েতার বাবা খোকন সরকার। একসময় যিনি অঙ্কন শিল্পী হিসেবে পরিচিত ছিলেন, আজ তিনি প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে ঠিকমতো হাঁটতেও পারেন না। পরিবারের সেই কঠিন মুহূর্তে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল সোয়েতা। চারদিকে কান্না, অনিশ্চয়তা, বাবার শয্যাশায়ী জীবন—সব মিলিয়ে স্বপ্ন যেন থমকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তবুও হার মানেনি মেয়েটি।পাশের বাড়ির শিক্ষক বুদ্ধদেব চক্রবর্তীর বাড়িতে থেকে পরীক্ষার প্রস্তুতি চালিয়ে যান সোয়েতা। অন্যদিকে মা পিংকি সরকার মানুষের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করে মেয়ের পড়াশোনার খরচ জোগাতে লড়াই চালিয়ে গেছেন প্রতিদিন। নিজের কষ্ট, অভাব আর ক্লান্তিকে আড়াল করে শুধু মেয়ের স্বপ্নটাকে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছেন তিনি।ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত মেধাবী সোয়েতা। মাধ্যমিকেও প্রথম বিভাগে ৮৮ শতাংশ নম্বর পেয়েছিল সে। এবারের লক্ষ্য ছিল রাজ্যের প্রথম দশে জায়গা করে নেওয়া। কিন্তু জীবনের নিষ্ঠুর বাস্তবতা তার সেই স্বপ্নে ধাক্কা দেয়। তবুও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ৯১.২ শতাংশ নম্বর অর্জন যেন এক অসম্ভব জয়।সোয়েতা জানায়, তার স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা সবসময় তাকে পাশে পেয়েছেন। বিশেষ করে গৃহ শিক্ষক সাগর দেব, যিনি সম্পূর্ণ বিনা পারিশ্রমিকে তাকে পড়িয়েছেন। তাঁদের সহযোগিতা ছাড়া এই সাফল্য সম্ভব হত না বলেই মনে করে সে।কলা বিভাগের এই মেধাবী ছাত্রী ভবিষ্যতে ডি.এল.এড করে শিক্ষক হতে চায়। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে, সেই স্বপ্ন আদৌ পূরণ হবে কিনা তা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবুও আশা ছাড়েনি পরিবার। এলাকার বিধায়ক বিন্দু দেবনাথ এর কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন তারা, যেন এই মেধাবী মেয়েটির স্বপ্ন অর্থের অভাবে থেমে না যায়।অভাবের অন্ধকার ভেদ করে সোয়েতার এই সাফল্য আজ কাঁঠালিয়ার বহু দরিদ্র পরিবারের কাছে এক অনুপ্রেরণার নাম। কারণ, স্বপ্ন যদি সত্যি হয়, তাহলে চোখের জল আর কষ্টের মধ্যেও একদিন জয় আসবেই।কাঁঠালিয়ার মেধাবী ছাত্রী সোয়েতা সরকারের অসাধারণ সাফল্যের খবর প্রকাশ্যে আসতেই তার পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে এলেন এলাকার একদল সমাজসেবী। কাঁঠালিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় ৯১.২ শতাংশ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ সোয়েতার বাড়িতে গিয়ে তার পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতির খোঁজখবর নেন তারা এবং ভবিষ্যতের পড়াশোনার জন্য সর্বতোভাবে পাশে থাকার আশ্বাস দেন।এদিন সোয়েতার বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন সমাজসেবী রতন দেবনাথ, সুব্রত পাল, রাজীব সাহা, বিপ্লব দাস, সুকান্ত চৌধুরী সহ আরও অনেকে। তারা সোয়েতার পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন এবং মেয়েটির উচ্চশিক্ষার পথ যাতে আর্থিক সমস্যার কারণে থেমে না যায়, সেই বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।সুব্রত পাল জানান, “সংবাদ মাধ্যমে সোয়েতার সংগ্রামের কথা জানতে পেরে আমরা সকলে একত্রিত হয়ে আজ তার বাড়িতে এসেছি। অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও সোয়েতা যে ফলাফল করেছে, সত্যি সে আজ কাঁঠালিয়ার গর্ব।
