বিলোনিয়া, প্রতাপ দেববর্মা : এই প্রথমবারের মতো কাঁটাতারের ছায়ায় গড়গড়িয়ে চলল সম্প্রীতির রথ। হিন্দু-মুসলিমের যৌথ রশির টানে মাসির বাড়ি চললেন জগন্নাথ, মুসলিম যুবকের হাতেই প্রাণ পেল দেবমূর্তি ও রথ।
জয় জগন্নাথ ধ্বনিতে যখন আকাশ বাতাস কাঁপছে, তখন কৃষ্ণ-রাধার সাজে নৃত্যের তালে তালে গড়গড় করে গড়িয়ে চলল রথের চাকা।
কাঁটাতারের শীতল পরশ লাগা সীমান্তের গ্রাম আমজাদ নগরে বৃহস্পতিবার ঘটল সেই বিরল দৃশ্য। হিন্দু-মুসলিমের যৌথ দড়ির টানে ইতিহাস লিখল সম্প্রীতির রথ।
ভারত-বাংলা সীমান্ত লাগোয়া আমজাদ নগরে সংখ্যালঘু মুসলিমের পাশাপাশি হিন্দুদেরও বসবাস। রথযাত্রা হিন্দুদের ধর্মীয় উৎসব হলেও এদিনের ছবিটা ছিল অন্যরকম।
ধর্ম ও সম্প্রদায়ের প্রাচীর ভেঙে হিন্দু-মুসলিম একাত্ম হয়ে রথের রশিতে টান দিল। বুঝিয়ে দিল, ধর্ম ভিন্ন হলেও হৃদয়ের রঙ এক। আমজাদ নগর আবারও প্রমাণ করল, ভারতের ঐতিহ্যের শিকড় গাঁথা আছে একতার মাটিতে।
এই দিনের সবচেয়ে বড় চমক লুকিয়ে ছিল রথ আর মূর্তির জন্মকথায়। কাঠের গায়ে ছেনি চালিয়ে প্রভু জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার প্রতিকী মূর্তি গড়েছেন এক মুসলিম যুবক।
শুধু মূর্তিই নয়, সম্প্রীতির রথটিও তৈরি হয়েছে তাঁরই হাতের পরশে। আমজাদ নগর বাজার থেকে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জগন্নাথ -বলরাম-সুভদ্রাকে রথে তুলে গোটা এলাকা পরিক্রমা করালেন দুই সম্প্রদায়ের মানুষ।
এদিনের রথ যেন চিনতেই পারল না কে হিন্দু, কে মুসলিম। “ওরা হিন্দু, ওরা মুসলিম” এই বিভেদের কালিমা ধুয়ে মুছে গেল রথের চাকার তলায়।
কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, নৃত্যের ছন্দে ছন্দ মিলিয়ে প্রভু জগন্নাথের রথ টেনে নিয়ে গেল মাসির বাড়ির দিকে। উৎসবের রঙে রাঙা হল আমজাদ নগর, আর সেই রঙে আঁকা হল নতুন ভারতের এক টুকরো ছবি।
কাঁটাতারের ওপারে দেশ ভাগ হলেও এপারে ভাগ হয়নি মানুষের মন। আমজাদ নগরের রথযাত্রা আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, সম্প্রীতির এই রথের চাকা থামবার নয়।
ধর্মের নামে বিভেদের কারবারিরা যখন বিষ ছড়ায়, তখন সীমান্তের এই গ্রাম ভালোবাসার রশিতে বাঁধে হাজারো হৃদয়।
আমজাদ নগরে সম্প্রতি রথের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, ঋষ্যমুখ পঞ্চায়েতে সমিতির চেয়ারম্যান শম্ভু কর, বিলোনিয়া থানার ওসি সঞ্জিত সেন, বিশিষ্ট আইনজীবী দেবাশিস কর, দক্ষিণ জেলা পরিষদের সুমন দেবনাথ, আমজাদ নগর গ্ৰাম পঞ্চায়েতের প্রধান সানায়ারা বেগম সহ রথ যাত্রার কমিটির সভাপতি ও সম্পাদক সহ অন্যান্য অতিথিরা।
